27 C
Guwahati
Friday, September 30, 2022
More

    সম্পাদকীয়ঃ নেতাজি মৃত্যুর চেয়ে বড়

    তমোজিৎ সাহা

    রহস্যে ঘেরা তাঁর মৃত্যু। এখনো প্রমাণিত নয় তিনি ঠিক বিমান দুর্ঘটনাতেই প্রাণ হারিয়েছিলেন কিনা। হ্যাঁ, আমরা দেশমাতৃকার বীর সন্তান দেশনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর কথা বলছি। নেতাজির মৃত্যুরহস্যে ১৮ আগস্ট তারিখটি দীর্ঘকাল থেকে বিতর্ক তৈরি করে রেখেছে। ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইওয়ানে একটি বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করা হয়ে থাকলেও তা এখনো পর্যন্ত প্রমাণিত সত্য নয়। কারণ কেউ এই দাবির স্বপক্ষে উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ দিতে পারেনি। বিভিন্ন সময়ে ভারত সরকারও বিষয়টির উপযুক্ত তদন্ত করে এই বিতর্কের অবসান ঘটাবার সম্পূর্ণ চেষ্টা করেনি। একাধিক তদন্ত কমিশন গঠন হলেও এই রহস্যের সুরাহা হয়নি। ছ’বছর আগে কেন্দ্রে আসীন হওয়া মোদি সরকারও এ সংক্রান্ত গোপনীয় সব ফাইল প্রকাশ্যে এনে রহস্যের কিনারা করবার প্রতিশ্রুতি দিলেও সবকিছুই ওই প্রতিশ্রুতিতেই আটকে আছে। কিছু ফাইল প্রকাশ করা হলেও একথা জানা গেল  না ১৯৪৫ সালের  ১৮ আগস্টের পর নেতাজি জীবিত ছিলেন কিনা। এখনো রাশিয়া জাপান সহ ভারত সরকারের হাতে থাকা বহু গোপন ফাইল প্রকাশ্যে আসা বাকি। কেন্দ্র সরকারও অনেকদিন আগেই ফাইল প্রকাশ মাঝপথেই বন্ধ করে রেখেছে। জনমানসে নেতাজির আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সস্তা নোংরা রাজনীতি করাই তাদের কাজ।

    আমাদের মনে আছে, গত কয়েকবছর আগে যখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অরুণ জেটলি জীবিত, তিনি টুইট করে  নেতাজির প্রয়াণ দিবসকে স্বীকার করে নিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু গতকাল তো পূর্বতন সব নজিরকে ছাপিয়ে শাসক বিজেপি সহ বিরোধী কংগ্রেস আপ শিবির থেকে একের পর এক টুইটে নেতাজির প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাবার্তা সোসাল  মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি করে। এই ঘটনায় রাজনেতারা পুনরায় প্রমাণ করলেন নেতাজির গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা জনমানসে বিপুলভাবে উপস্হিত এবং তাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক রুটি সেঁকে নিতে তারা কেউ কারোর চেয়ে কম যান না। আবার তাদের এ কাজের প্রচুর সমালোচনা এ সত্যকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করল যে নেতাজির প্রতি ভারতবাসীর শ্রদ্ধা ও সম্মান এতটাই যে তারা এর পেছনের  রাজনীতিটা ভালোই বোঝেন এবং নেতাজির বিতর্কিত মৃত্যু তারিখকে মোটেই বিশ্বাস করেন না।

    গত মঙ্গলবার সকাল থেকেই শুরু হয় এই টুইটবন্যা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রমেশ পোখরিয়াল নিশাঙ্ক টুইট করে লিখেন, ‘আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রতিষ্ঠাতা, অদ্বিতীয় যোদ্ধা এবং দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রণী সেনানী নেতাজিকে তাঁর পুণ্যতিথিতে কোটি কোটি প্রণাম।’ রাজস্হানের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিজেপি নেত্রী বসুন্ধরা রাজেও টুইটারে লিখেছেন,’তোমরা আমায় রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব!  আজাদ হিন্দ ফৌজের সংস্হাপক, মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর পুণ্যতিথিতে চরণ বন্দনা করি। দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর সংগ্রামের কাহিনী স্মরণমাত্রই  দেশবাসীকে রাষ্ট্রভক্তির ভাবনায় ভরিয়ে তোলে। আবার এদিন সকালে কংগ্রেসের দলীয় টুইটার হ্যান্ডেল থেকে টুইট করে বলা হয়, ‘নেতাজি একজন জাতীয় নায়ক। দেশের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা আজকের প্রজন্মের কাছে আদর্শ। তাঁর প্রয়াণ দিবসে আমরা আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাই।’ রাজস্হানের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলোতও টুইটার ফেসবুকে নেতাজির প্রয়াণ দিবসকে স্মরণ করে পোস্ট করেন। দিল্লির উপমুখ্যমন্ত্রী আপ নেতা মণীশ শিসোদিয়া, গুজরাটের তরুণ কংগ্রেস নেতা হার্দিক প্যাটেল সহ কংগ্রেস বিজেপি এবং অন্যান্য দলের ছোটবড় নেতাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি বার্তায় সামাজিক মাধ্যমে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কংগ্রেস বিজেপি প্রভাবিত বিভিন্ন নামের ফেসবুক পেজেও নেতাজিকে শ্রদ্ধা জানাতে দেখা যায়। এমনকি বরাক উপত্যকারও কেউ কেউ নেতাজির প্রয়াণ দিবসকে ফেসবুকে স্মরণ করেন। 

    সারা দেশের নেতাজি প্রেমী বহু মানুষ রাজনেতাদের এমন আচরণের তীব্র নিন্দা জানান। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টুইট করে জানান, ‘১৯৪৫ সালের আজকের দিনে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু চিরতরে অদৃশ্য হয়ে যান। সেদিন, তাইওয়ানের তাইহোকু বিমানবন্দর থেকে একটি বিমানে রওয়ানা হয়েছিলেন তিনি। তাঁর কী হয়েছে আমরা এখনো জানি না। দেশের মানুষের এই মহান সন্তানের সম্পর্কে জানার অধিকার রয়েছে।’ এদিকে লোকসভায় বিরোধী দলনেতা অধীর চৌধুরী তাঁর দলের অন্যান্য নেতাদের পথে না গিয়ে স্পষ্টভাবে জবাব দেন, ‘ট্র্যাজিক হিরো নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নাকি আজকের দিনেই তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। তবে তিনি মারা গিয়েছিলেন কি না তা কোনো প্রামাণিক সূত্র দ্বারা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তিনিই একমাত্র  জাতীয়তাবাদী নায়ক এবং বিশ্ব ব্যক্তিত্ব যার একমাত্র জন্মবার্ষিকী পালন করা হয়, তাঁর মৃত্যুর তারিখ সম্পর্কে কোনো সংস্হা জানে না।’ নেতাজির প্রতিষ্ঠিত ফরোয়ার্ড  ব্লকের রাজ্য সম্পাদক নরেন চট্টোপাধ্যায় এই বিতর্কের প্রেক্ষিতে বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন, ‘নেতাজির মৃত্যু নিয়ে কোনো ঘোষিত সিদ্ধান্ত হয়নি। তা সত্ত্বেও যদি কেউ মত্যুবার্ষিকীর কথা উল্লেখ করে তবে তারা বৃহৎ পুঁজির হাতে বিকিয়ে গিয়েছেন। কারণ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু   সবসময় বৃহৎ পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে ছিলেন।  তিনি দেশের জনতাকে নিয়ে দেশ গড়তে চেয়েছিলেন।’

    নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে প্রথম থেকেই কংগ্রেসের  অবস্হান ছিল যে নেতাজি ওই ১৮ আগস্টের বিমান দুর্ঘটনাতেই প্রাণ হারিয়েছেন।  ১৯৪৬ সালে সর্দার প্যাটেল নিজেই এই অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন। পরে মোরারজি দেশাই যখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন, তিনিও একই সরকারি বয়ান দিয়েছিলেন। এতদিন কংগ্রেসের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ ছিল এবার বিজেপি নেতারাও নেতাজির মৃত্যুদিন পালন করে এই ধারণাকেই বৈধতা দিয়ে দিলেন যে ১৮ আগস্টেই নেতাজির প্রয়াণ ঘটেছিল। 

    এই ঘটনা থেকে একটা বিষয় প্রমাণ হল যে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দার জন্য নেতাজির আইকনিক জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে রাজনেতারা যতটা ব্যস্ত নেতাজির আদর্শ পালনে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না। আর একটা কথা সকলের জেনে রাখা উচিত যতই নেতাজির মৃত্যুদিন খোঁজার চেষ্টা হোক বা মৃত্যুদিন পালন করা হোক না কেন আসলে নেতাজি মৃত্যুর চেয়ে বড়,  তাঁর মৃত্যু নেই।

    Published:

    Follow TIME8.IN on TWITTER, INSTAGRAM, FACEBOOK and on YOUTUBE to stay in the know with what’s happening in the world around you – in real time

    First published

    ট্ৰেণ্ডিং