27 C
Guwahati
Tuesday, November 30, 2021
More

    মতামত- পৃথক আঞ্চলিক দলই বরাকের সব বঞ্চনা থেকে মুক্তি দিতে পারে

    প্রদীপ দত্তরায়

    আসামের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বরাক উপত্যকার মানুষের দুর্ভোগ চরম সীমানায় পৌঁছে গেছে। বরাক উপত্যকার প্রতি যেভাবে বৈষম্য চলছে তাতে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। কি কংগ্রেস কি বিজেপি যে কোনও দলই হোক না কেন, বরাক উপত্যকার মানুষের সঙ্গে বৈষম্য চিরদিনই চলে আসছে। এখন চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছে তা। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বলেছিল, তারা ক্ষমতায় এলে ডিটেনশন ক্যাম্প গুড়িয়ে দেবে। গুঁড়িয়ে দেওয়া তো দূরের কথা, উল্টো আরও ডিটেনশন ক্যাম্প বাড়ানো হয়েছে। আসাম চুক্তির ৬ নম্বর ধারার নামে বরাক উপত্যকার মানুষকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানানোর একটা চক্রান্ত চলছে।এই ছয় নম্বর ধারায় বলা হচ্ছে, যারা  ১৯৫১ সালের আগে আসামে এসেছেন তারাই একমাত্র নাগরিকত্ব পাবেন। তারাই একমাত্র চাকরি পাবেন, জমিজমা কিনতে পারবেন। এটা যদি আইনে পরিণত হয় তাহলে কি করে বরাক উপত্যকার মানুষ তাদের অস্তিত্ব প্রমাণ করবেন? আমি মনে করি, ৬০ শতাংশ মানুষ  এই আইনের আওতায় আসবেন না। ভারতবর্ষে অসমকে নিয়ে নেহেরু-লিয়াকৎ চুক্তি হয়েছে, ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি হয়েছে, আসাম চুক্তি হয়েছে।তাহলে আবার কি করে অসম চুক্তির ৬ নম্বর ধারাকে পুনর্বিবেচনা করে আইনে পরিণত করার জন্য একটি হাই পাওয়ার কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। তাতে সুপারিশ করা হয়েছে, ১৯৫১ সালের আগে যারা ভারতে এসেছেন তারাই একমাত্র সমস্ত সুযোগ সুবিধা পাবেন। এটা কি সম্ভব হবে? যেখানে আসাম চুক্তিতে বলা হয়েছিল, যারা ১৯৭১ সালের আগে এসেছেন তারা সমস্ত সুযোগ সুবিধা পাবেন। এখন আবার বলা হচ্ছে ১৯৫১ সাল। এসব নিয়ে গোটা আসামের বাঙালি এবং সংখ্যালঘু মানুষদের সঙ্গে ছিনিমিনি খেলা চলছে।

    শুধু তাই নয়, বরাক উপত্যকার মানুষের সঙ্গে আগেও বৈষম্য হয়েছে, এখনও সমানতালে বৈষম্য চলছে। তার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। প্রথমত মহাসড়ক, যা আজ পর্যন্ত কাজ শেষ হচ্ছে না। প্রথমদিকে অজুহাত ছিল, বনবিভাগের ছাড়পত্র নিতে হবে। বন বিভাগ ছাড়পত্র দিয়ে দিয়েছে, তারপরও ১ ইঞ্চিও কাজ হচ্ছে না। একইভাবে পাঁচগ্রাম কাগজ কল বন্ধ হয়ে আছে। নির্বাচনের আগে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছিলেন পেপার মিল চালু করবেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত তা চালু হয়নি। বন্ধ হয়ে আছে চিনি কল, বদরপুর টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি। আর বর্তমানে শিলচর মেডিক্যালের অবস্থা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। প্রায় ৫০ বছরের পুরনো মেডিক্যাল কলেজে নেই কার্ডিয়োলজিস্ট, নিউরোলজিস্ট। গত পাঁচ বছরে শিলচর মেডিক্যাল কলেজের একবিন্দু উন্নয়ন হয়নি। এছাড়া বরাক উপত্যকায় চাকরির ক্ষেত্রে হাহাকার চলছে। সম্প্রতি, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন বিভাগে প্রচুর নিযুক্তি হয়েছে। কিন্তু বরাক উপত্যকার ভাগ্যে একটিও চাকরি জুটেনি। এসবের পর বরাক উপত্যকার  মানুষ কেন অসমের সঙ্গে থাকবেন তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বরাক উপত্যকা দিসপুরের  কাছে শুধুমাত্র রাজস্ব আদায়ের জায়গা। শুধু রাজস্ব যাবে কিন্তু তার বিনিময়ে কিছু দেওয়া হবে না। এই সরকার আসার পর বরাক উপত্যকায় কত  প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তার হিসেব নেই। উড়ালপুলের স্বপ্ন পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। বাস্তবে তার কিছুই হয়নি। বরাক উপত্যকার মানুষের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। আমার সঙ্গে বরাক উপত্যকার তিন জেলায় বহু মানুষের টেলিফোনে যোগাযোগ হয়েছে, সবাই বলছেন বরাক উপত্যকার যদি নিজস্ব একটা পরিচয় না থাকে তাহলে বরাক উপত্যকার মানুষের পুনরুদ্ধার করার কেউ থাকবে না। কারণ, সর্বশেষ যে প্রমাণ পাওয়া গেছে সেটা শর্মা কমিটির রিপোর্ট ফাঁস হওয়ার পর। রিপোর্ট ফাঁস হওয়ার পর বিজেপি বা কংগ্রেস দল একটি কথাও বলেনি।কিন্তু বরাক উপত্যকার দুজন সাংসদ ও ১৫ জন বিধায়ক রয়াছেন, তারা কেউ কিন্তু এ বিষয় নিয়ে কোনও কথা বলছেন না। তাহলে তাদের আবার বিধায়ক করে কেন দিসপুর পাঠাব আমরা? তাই এই মুহূর্তে বরাক উপত্যকায় একটা পৃথক আঞ্চলিক দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা এসে গেছে। এই মুহূর্তে বরাক উপত্যকার জন্য একটা পৃথক রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন রয়েছে। সেটা নিয়ে আমি গভীর চিন্তা-ভাবনা করছি কিভাবে এই পৃথক রাজনৈতিক দল গঠন করা যায়।

    ১৯৮৩ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত আকসা যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আন্দোলন করেছিল সেই রকম একটি আন্দোলনের প্রয়োজন রয়েছে এই মুহূর্তে। আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে বরাক উপত্যকা থেকে নিজস্ব দশ-বারোজন প্রতিনিধি যদি বিধানসভায় পাঠানো যায় তাহলে রাজ্য সরকারের উপর একটা চাপ সৃষ্টি করা যাবে। পাশাপাশি আগামীতে দুজন সাংসদকেও দিল্লিতে পাঠাতে পারলে কেন্দ্র সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা যাবে। তবে নতুন যে রাজনৈতিক দল গঠন করা হবে সেটা বরাক উপত্যকায় হিন্দু-মুসলিম মনিপুরী ডিমাসা সহ আরও যারা যারা রয়েছেন তাদের সবাইকে নিয়েই করতে হবে। যেভাবে আকসা আন্দোলনে সবাইকে সামিল করা হয়েছিল, ঠিক একই ভাবে এই নতুন আঞ্চলিক দলে সবাইকে সামিল করতে হবে। করোনার সংক্রমণ কাটিয়ে উঠার পরই একটা অভিবর্তন করে আঞ্চলিক দল গঠন এবং বরাকবাসীর ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হবে। যাতে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে বরাকের ১৫টি আসনেই আমাদের নিজস্ব আঞ্চলিক দল থেকে প্রার্থী দেওয়া যায়।

    (লেখক, আকসা-র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং গৌহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী)

    —-– প্রকাশিত মতামত লেখকের ব্যক্তিগত এবং তা কোনওভাবেই TIME8 এর প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না।

    Published:

    Follow TIME8.IN on TWITTER, INSTAGRAM, FACEBOOK and on YOUTUBE to stay in the know with what’s happening in the world around you – in real time

    First published

    ট্ৰেণ্ডিং