16 C
Guwahati
Thursday, January 20, 2022
More

    বোকাদাদার ঝুলি-৩

    অভিজিৎ মিত্র

    আজ শোনাব গোবর দেশের তিনজন বিখ্যাত ব্যক্তির গল্প। চুলুলুলু, ঘ্যাঁঘো আর গেঁটেদাদা। তিনজনেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বমহিমায় বিরাজমান। জনপ্রিয়তায় তিনজনেরই টি-আর-পি তুঙ্গে।

    চুলুলুলু রাজনীতি করে। গোবরদেশের বিরোধীদলের পান্ডা। রোজ সকালে উঠে হবুকে গাল না পেড়ে দাঁত মাজে না। সে নিজেকে গোবর দেশের সবথেকে বঞ্চিত ড্যাশের দলে মনে করে। কারন তার বাবা রলু, ঠাকুমা ইলু আর ঠাকুমার বাবা জলু নাকি গোবরদেশের রাজা ছিল। সেইজন্য সে ভেবেছিল গোবরদেশের সিংহাসনে তারই বাবাকালি অধিকার। কিন্তু প্রজাদের ভোটে হেরে গিয়ে তার সেই আশা জলে ডুবে যাবার পর থেকে সে যাকে সামনে পায় তাকেই হবুর প্রাসাদের দিকে আঙুল দেখিয়ে মিনমিনে গলায় গান শোনায় ‘ছোড় আয়ে হাম য়ো গলিয়াঁ’। সেই বেসুরো গান শুনে প্রজারা পালিয়ে যাবার পথ পায় না। এমনকি চুলুলুলু যবে থেকে এই গান শুরু করেছে, কোন মেয়ে আর তাকে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছে না। চুলুলুলু-র মা রাগের চোটে তাকে খুন্তি দিয়ে মারতে মারতে একবার নাকি চেঁচিয়ে ‘তু চুল্লুভর পানি মে ডুব মর, নাল্লা কাঁহিকা!’ বলে বাড়ি আর পার্টি থেকে বের করে দিয়েছিল। সেই থেকে নাকি চুলুলুলু নামের উৎপত্তি। আসল সত্যিটা এখনো কেউ জানে না। তবে এটা ঠিক, ফোন আর বইমুখে চুলুলুলু-র প্রচুর ফ্যান আছে। চুলুলুলু হবুকে রোজ গালাগাল দেবার পর তারা সবাই পালা করে হাততালি দেয়। সেটা চুলুলুলু-র সমর্থনে না সার্কাস দেখে মজা পেয়ে – সেটা অবশ্য কেউ জানে না।

    ঘ্যাঁঘো স্বনামধন্য ব্যবসাদার। গোবরদেশের পশ্চিমদিকে বোমারাজ্যে সমুদ্রের পাড়ে তার বিশা-আ-আ-আ-আ-ল বড় বাড়ি। ঘ্যাঁঘো গোবরদেশের সবথেকে তুখোড় ব্যবসায়ী। আলপিন থেকে আলু হয়ে আসমান অব্ধি তার ব্যবসা করার ইচ্ছে। হাত কচলে দাঁত বের করে হবুর কোষাগার থেকে বা ডাবুর দেশ থেকে কিভাবে মোহর বের করে আনতে হয়, তা ঘ্যাঁঘোর মত কেউ জানে না। শোনা যায় ঘ্যাঁঘো যে কোন প্রজাকে ঘানিতে ফিট করে তার থেকেও তেল বের করে নিতে পারে। ঘ্যাঁঘোর বাবা ছিলেন সকলের প্রিয় বানিভাই। সেইজন্য কেউ কেউ ঘ্যাঁঘোকে পারিবারিক সূত্রে বানিভাই বলেই ডাকে। নিন্দুকেরা বানিয়াভাই আর ছোটলোক অশিক্ষিতরা কিছু না বুঝেই ড্রাকুলাভাই বলে ডাকে। গোবর দেশের ডাক-হরকরা ব্যবস্থা ঘ্যাঁঘো একাই সামলায়, আর কাউকে পা রাখতে দেয় না। শোনা যায়, ঘ্যাঁঘো কখনো রাগে না, কিন্তু রেগে গেলে নাকি নিজের ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বীদের, এমনকি নিজের ছোট ভাইকেও ‘গ-র-র-র-র ঘ্যাঁ ঘোঁ’ বলে কামড়ে দিতে ছাড়ে না। সেজন্যই তার নাম হয়েছে ঘ্যাঁঘো। 

    গেঁটেদাদা এদের সবার ভেতর সবথেকে অদ্ভুত। বড় বড় গোঁফদাড়ি রাখে, নিজেকে যোগাসনগুরু বলে চিহ্নিত করে, যদিও কেউ বোঝে না সে আদপে রাজনীতি করে নাকি ব্যবসা করে। এটা ঠিক, গেঁটেদাদার যোগাসনের আশ্রম বাড়তে বাড়তে এখন এত বড় হয়ে গেছে যে ইচ্ছে করলেই গেঁটেদাদা হবুর কাছে আবেদন করে নিজের একটা প্রদেশ খোলার কথা বলতেই পারে। সেই আশ্রমের ক্ষেতে খামারে খনিতে গাছে আকাশে এত চাল-ডাল-নুন-আলু-মধু-ওষুধ-টুথপেষ্ট-চাউমিন-ডিটারজেন্ট-শ্যাম্পু-সাবান-কসমেটিক্‌স-শিলাজিৎ-তথ্যপ্রযুক্তি হয় আর সেগুলো এত বিক্রিবাটা হয় যে ঘ্যাঁঘো পর্যন্ত ঘাবড়ে যায়। লোকমুখে শোনা যায় যে হবুর পেয়াদারা নাকি বেশ কয়েকবার গেঁটেদাদাকে এসে ধরেছিল সত্যিকথা চেপে যাবার জন্য, আমলকি গাছের ছাল ছাড়ানো নিয়ে আর ছোঁয়াচে রোগের কানামাছি ভোঁ ভোঁ ওষুধ বানানো নিয়ে। কিন্তু গেঁটেদাদা নির্বিকার। তার মতে, এসব ছোটখাট ব্যাপার নিয়ে ভাবতে গেলে যোগ হয় না – সে সম্পত্তি-যোগ হোক আর আসন-যোগ হোক। গেঁটেদাদা রোজ যোগাসন করতে করতে মাটি থেকে তিন ইঞ্চি ওপরে উঠে যায়। তারপর নিজের বাঁ পা দিয়ে ডানকান চুলকোতে পারে বা ডানহাত দিয়ে ডানদিকের পিঠের নিচে নির্ভুল ট্যাটু আঁকতে পারে। যোগাসন করতে করতে গেঁটেদাদা তার বিখ্যাত স্টান্টে পেট নাচিয়ে শিরদাঁড়ায় ঘষে গেঁটেবাত সারিয়ে দেবার কথা ঘোষনা করেছিল। সেই শুনে সবাই দুহাত কপালে তুলে তাকে গেঁটেদাদা নাম দিয়েছে।  

    তো, এহেন চুলুলুলু, ঘ্যাঁঘো আর গেঁটেদাদা একদিন রাস্তা দিয়ে একসঙ্গে যাচ্ছিল। সেই সময় তাদের সামনে হঠাৎ এক বাঘ চলে আসে। সে এক দুর্দান্ত দুর্ধর্ষ পিলে চমকে দেওয়া চমৎকার বাঘ। যা আগে কেউ কোনোদিনও দেখেনি শোনেনি। এইরকম বাঘ, এর আগে শোনা যায় চিবু আর ডাবু-র দেশে নাকি দেখা গেছিল। যদিও ডাবু দাবি করে চিবু নাকি সেই বাঘ ইচ্ছে করে ডাবুর দেশে ছেড়ে এসেছিল। অবশ্য সত্যি-মিথ্যে কেউ জানে না। সে যাই হোক, এরকম বাঘ গোবর দেশে বাপের জন্মে কেউ দেখে নি।

    বাঘ দেখেই চুলুলুলু-র মাথায় এক নতুন বুদ্ধি আসে, হবুকে ফ্রেশ্‌ গালাগাল দেবার। হবু নিশ্চয় চিবুর সঙ্গে গেম খেলে এই বাঘ গোবর দেশে এনেছে। সকালে চিবুর সঙ্গে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা, চিবু-কে ব্যান করার চিলচিৎকার, আর রাত্তিরে চিবুর সঙ্গে গোপন বৈঠক সেরে দেশে বাঘ ধরে আনা! দেশের মানুষের সঙ্গে চিটিংবাজি! দাঁড়া ব্যাটা গজুর পো হবু, তোকে দেখাচ্ছি মজা।

    চুলুলুলু যখন এইসব ভাবছে আর উত্তেজনায় নিজের চুল ছিঁড়ছে, তখন ঘ্যাঁঘোর মনে এক অন্য চিন্তা। এই বাঘ দেখে তো বেশ শক্তপোক্ত বলেই মনে হচ্ছে, অর্থাৎ কিছু মানুষ তো খাবেই, তখন দেশে হাহাকার পড়ে যাবে। বাঘের ভয়ে লোকেরা দৌড়োদৌড়ি করে পালাতে যাবে, ওমনি হবুর সরকার তাদের নিরাপত্তার খাতিরে রাস্তা-ঘাট-বাড়ি-বাজার-শুঁড়িখানা-চাখানা-কারখানা সব জায়গায় তালা দিয়ে দেবে। বলবে, কেউ বেরিও না বাপু, সরকার আগে খাঁচা তৈরি করে বাঘ ধরুক। ওমনি ঘ্যাঁঘো নিজের কারবার থেকে বেশ কিছু গরীব-গুর্বো মজদুরকে বের করে দেবে। তারপর হবুর কাছে গিয়ে তালাবন্ধের জন্য ভয়ানক লোকসানের নাকিকান্না শুরু করবে। হবু নিশ্চয় কিছু মোহর ধার দেবে। চাই কি ডাবুর দেশ থেকেও কয়েকজন ঘ্যাঁঘো টাইপ ব্যবসায়ীর থেকে মোহর নেওয়া যেতে পারে। এবার আর শুধু গোবর দেশের ডাক-হরকরা নয়, পুরো আনাজপাতির বাজারের ওপরেও ঘ্যাঁঘোর একাধিপত্য তৈরি হবে। নিজের বুদ্ধিতে ঘ্যাঁঘো নিজেই আপ্লুত হয়ে দাঁত বের করে ফেলল।

    গেঁটেদাদা তখন একচোখ ছোট করে দাড়িতে তা দিতে দিতে ভাবছে, কথায় আছে, বাঘে ছুঁলে আঠেরো ঘা। এই একেক ঘায়ের জন্য গেঁটেদাদা একেক রকম আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরি করবে। গোবর দেশের মানুষের মাথায় এমনিও গোবর ভরা। এদের একটু ভয় দেখালেই সবাই সুড়সুড় করে গেঁটেদাদার ওষুধ কিনতে শুরু করবে। কেউ ভেবেও দেখবে না কোন্‌টা ঠিক কোন্‌টা ভুল, কেন ঠিক কেন ভুল। শুধু ভয়টা ঠিকঠাক দেখাতে পারলেই কেল্লা ফতে! একটা বেশ জুতসই নামও দরকার এইসব ওষুধের। ‘বাঘানীল’ কেমন নাম? নট ব্যাড। গেঁটেদাদার বহুদিনের স্বপ্ন অঢেল টাকা জমিয়ে বিদেশে সমুদ্রের মাঝে একটা ছোট দ্বীপ কেনার – এবার মনে হচ্ছে সেই স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে।

    এদিকে বাঘ খানিক ভেবেচিন্তে প্রথমে চুলুলুলু-র দিকে যেতে শুরু করল। ফুট তিনেকের ভেতর আসতেই চুলুলুলু তার সেই বিখ্যাত কাবুলিওয়ালা মার্কা গান ‘ছোড় আয়ে হাম য়ো গলিয়াঁ’ শুরু করে দিল। বাঘটা থতমত খেয়ে বেশ খানিকক্ষণ চুলুলুলু-কে মাথা থেকে পা অব্ধি মাপল। দেখল আশেপাশে ওর মা আছে কিনা। শেষে ফ্যাঁচকু টাইপ এমন একটা মুখভঙ্গি করল যে সেটা হাঁচি না হাসি না রাগ না হতাশা না ধিক্কার না গালাগাল, কেউ বুঝল না।

    চুলুলুলুর থেকে মুখ ঘুরিয়ে বাঘ ঘ্যাঁঘোর দিকে যেতে শুরু করতেই ঘ্যাঁঘো আর গেঁটেদাদা একসঙ্গে বাঘের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার মাপজোক ওজন এইসব নিতে শুরু করল। গেঁটেদাদা তো দাড়ি নাচিয়ে বাঘের গন্ধও শুঁকতে শুরু করল যাতে জড়িবুটি-টা বেশ খোলতাই হয়। বাঘটা ঘ্যাঁঘো আর গেঁটেদাদার এইসব ছিঁচকেমি দেখে খানিকটা ঘাবড়ে গিয়ে বিরক্তি আর অস্বস্তি নিয়ে ‘এই বুদু, চাম খা’ গোছের কিছু একটা দুর্বোধ্য ভাষা বলে ওখান থেকে পালিয়ে গেল।

    চুলুলুলু, ঘ্যাঁঘো আর গেঁটেদাদা আবার যেতে শুরু করল। যেতে যেতে গ্রামের এক চাতালে ওরা কিছু লোক দেখতে পেল। তারা নিজেদের ভেতর গল্প ঠাট্টা করছিল, তাস খেলছিল, হুঁকো খাচ্ছিল। চুলুলুলু গিয়ে ওদের মাঝে বসে পড়ল। ‘তোমরা কি জানো যে হবু তোমাদের ধোঁকা দিচ্ছে? চিবুর দেশ থেকে এক আশ্চর্য বাঘ এনেছে যা তোমাদের যে কোন সময় খেয়ে নিতে পারে? তোমাদের ভয় লাগছে না?’ লোকগুলো চুলুলুলুর কথায় হেসে ফেলল। ‘বাবু, আমরা কি করে জানব যে তুমি আমাদের উল্লু বানাচ্ছ না?’ এবার ঘ্যাঁঘো এগিয়ে এল। ‘বাঘের ভয়ে যদি কাজে যেতে না পারো আর তখন যদি তোমাদের চাকরি চলে যায়, তাহলে কি করবে? আমার বোমারাজ্যে আসবে চাকরি করতে? আমি কিন্তু তোমাদের সেই সুযোগ করে দিতে পারি’। লোকগুলো মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। ‘বাবু, আমরা সবাই এখানে কিষান। নিজের ক্ষেতে ফসল ফলাই, যা পাই তাই দিয়েই পেট চালাই। বেশি রোজগারের কোন লোভ নেই। তুমি চাকরি দিতে চাইলে শিঙেরাজ্যে চলে যাও। ওখানে সবাই চাকরি খুঁজতে বোমারাজ্যে যায়’। এতক্ষন গেঁটেদাদা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। এবার সেখান থেকেই চেঁচিয়ে উঠল। ‘বোকা কোথাকার! এটাও জানো না যে সেই বাঘের গন্ধ আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে? সেই গন্ধ তোমাদের নাকে গেলেই তোমরা মারা যাবে। যতক্ষন না আয়ুর্বেদিক জরিবুটি তৈরি হচ্ছে, ততক্ষন যাও, ঘরের ভেতরেই থাকো’। গেঁটেদাদার চিৎকার শুনে তারা সবাই আস্তে আস্তে নিজের বাড়ির দিকে রওনা দিল।

    তারপর চুলুলুলু, ঘ্যাঁঘো আর গেঁটেদাদা সেই চাতালে জমিয়ে বসল। আর গেঁটেদাদা মুখ খুলল। ‘ভাইসব, আমরা নিশ্চয়ই এবার বুঝে গেছি যে আমাদের কোথায় যেতে হবে, কি করতে হবে। আর বাঘের গল্প কিভাবে লিখতে হবে। তাহলে ফেরা যাক’। সেই যে ওরা তিনজন চলে গেল, তারপর আর কেউ গোবরদেশে বাঘ থাকাকালীন ওদের কাউকে বাইরে আসতে দেখেনি। শুধু মাঝে মাঝে ফোনে আর বইমুখে চুলুলুলুর নতুন নতুন গালাগাল শোনা যেত আর ঘ্যাঁঘো গেঁটেদাদার বাড়ি থেকে ঝনঝন মোহরের শব্দ।

    (এটা গোবরদেশের চুপকথার গল্প। ছেলে ভোলানোর জন্য বয়স্করা এসব বলে থাকে। কেউ যদি এর সঙ্গে কারো মিল খুঁজে পান, সেটা নেহাতই কাকতালীয়)

    Published:

    Follow TIME8.IN on TWITTER, INSTAGRAM, FACEBOOK and on YOUTUBE to stay in the know with what’s happening in the world around you – in real time

    First published

    ট্ৰেণ্ডিং