17 C
Guwahati
Thursday, January 20, 2022
More

    বোকাদাদার ঝুলি – ২

    অভিজিৎ মিত্র

    গোবর দেশের রাজা হবুর ছিল এক তবু বোন। সে ছিল এক দারুন হেব্বি বোন। শিঙেরাজ্যের পাটমন্ত্রী। খুব গুণী। এমন কিছু নেই যা সে জানত না। কবিতা লেখা, গান লেখা, গান গাওয়া, সুর দেওয়া, ছবি আঁকা, ঢাক পেটানো, গুলগল্প শোনানো, ক্যারাটে মারা, থাপ্পড় মারা, উন্নয়ন করা, দান করা, হ্যামলিনের বাঁশি বাজানো, মাদারির খেল দেখানো, ভ্যানিশ করে দেওয়া…কি জানত না! শিঙেরাজ্যে তার গুণমুগ্ধ নেই, এরকম কেউ ছিল না। সেরকম কাউকে থাকতেই দেওয়া হত না। তবু বোনের ‘তবু মনে রেখো…’ গানের সঙ্গে হাততালি দিয়ে ২০ বছর আগে যারা শিঙে বাজাত, তারা সবাই আজ নিজগুণে আমলা হাকিম যন্ত্রী সান্ত্রী পেয়াদা কোটাল উজির নাজির মোসাহেব হয়ে গেছে। এদের সবার ভেতর সংস্কৃতির এত ছড়াছড়ি ছিল যে হাততালি দিয়ে ‘আমপাতা জোড়া জোড়া…’ আবৃত্তি করে পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দিত। তবুর কৃপায় শিঙেরাজ্য এত সুন্দর হয়ে উঠেছিল যে বাইরের রাজ্যের সবাই তাকে মনে মনে হিংসে করত।

    রাজ্যাভিষেকের পর থেকেই তবু নিজের বহুমুখী প্রতিভার স্ফূরন ঘটিয়ে একইসঙ্গে দেবী সরস্বতী ও লক্ষ্মী হয়ে ওঠেন। তার হাতের আঁকা ছবি কেনার জন্য বাইরে ভিড় পড়ে যেত। উৎসাহি ক্রেতায় ক্রেতায় পাছে মারামারি হয়, সেই ভয়ে গোপন অকশ্‌নে সেইসব ছবি বেচা হত। তার কবিতার বই বাজারে আসার সাথে সাথে গুণমুগ্ধ পাঠকের হাতে হাতে গরম কচুরির মত শেষ হয়ে যেত। পাছে রোদে-ঘামে কচুরি খেয়ে অম্বল হয়, সেই ভয়ে বইবিক্রেতা বইয়ের সঙ্গে ডাইজিন ফ্রি উপহার দিত। তবুর বীণার সুরে আকাশ বাতাস এতই ভরে উঠত যে পাখিরাও আকাশে উড়তে ভয় পেত। তবু ছিলেন শিঙেরাজ্যের গর্ব, ঠিক যেমন দেবী সরস্বতী স্বর্গের। এমনকি তবু তার রাজ্যের সবাইকে দান ও অনুপ্রেরণায় ভরিয়ে দিতেন। তবুর গানের হাততালি-স্যাঙাতরা জনে জনে জিজ্ঞেস করে বেড়াত “তবুদেবী আমাদের গর্ব ও অনুপ্রেরণা, ঠিক তো?” সব্বাই ডাইজিন চিবোতে চিবোতে বলত “ঠিক, ঠিক”।

    তবুর ভারি আক্ষেপ, তার কোষাগার ভর্তি মোহর নেই। ঐ যে বল্লাম, তবু এত দানী যে কেউ এলেই তাকে দান ধ্যান করেন। কেউ বিদ্যাসাগর-বাতি কিনতে চাইলে কোষাগার খালি করে গোটারাজ্য আলোয় ভরিয়ে দেন, কেউ আর্জেন্টিনা ঘুরে এসে নীল-সাদা রঙে রাজ্য রাঙিয়ে দিতে চাইলে তবু দরাজহস্ত, পাড়ার ছেলেরা মনসা পূজোর ধূনো কিনতেও তবুর কাছে হাত পাতলে তবু কোষাগার চেঁচেপুঁছে সাফ করে দেন। আবার কেউ চোলাই খেয়ে মারা গেলেও তবু তাকে কেষ্টর জীব হিসেবে ক্ষমা করে তার পরিবারকে মোহর দেন। এত দান ধ্যান করতে করতে যা হয় – তবুর হাতিশালে হাতি নেই, ঘোড়াশালে ঘোড়া নেই, ট্যাঁকশালে টাকা নেই। শুধু আছে ইতরশালে কিছু ইতর আর ত্যাঁদরশালে কিছু ত্যাঁদর। আর গোটা রাজ্য জুড়ে ঝালে-ঝোলে-অম্বলে একটাই হাকিম। এরকম দানী মানুষকে হবু ইচ্ছে করে মোহর দেয় না, সেই রাগে দুঃখে তবু একবার হবুভাইকে ‘ব্যাটা এক্সপ্যারি ডেট পেরিয়ে যাওয়া জোচ্চোর’ বলে গালাগাল দিয়ে থাপ্পড় মারার জন্য হাত তুলেছিল। হবু ক্যাওস থিয়োরী বুঝে গিয়ে সেই হাওয়া এড়িয়ে গেছিল। আর কিছুদিন পর এক ব্যাগ আম ফান হিসেবে তবুর রাজ্যে পাঠিয়ে বলেছিল, “আম খেয়ে আঁটি ফেলতে টাকা লাগলে বলিস বোন, আমি আছি”। হবু-তবুর এই আর-লং-ছিট খেলায় গোটা শিঙেবাসী বেশ মজা পেয়েছিল।

    সে যা হোক, তবুর মন খুব নরম। মমতায় ভরা। সবাইকে সাহায্য করতে ভালবাসে। নিজের দুজন মোসাহেবকে তবু অভিনয় আর গানের জগতে কত সুন্দর ফিট করে দিয়েছিল। একজনের ডায়লগ ‘সোনার কেল্লা দেখতে পাচ্ছ মুকুল?’ আর অন্যজনের গান ‘তুমি কোন্‌ কাননের ফুল’ বিখ্যাত হবার পর এরা যখন তবুকে ছেড়ে চলে যায়, তখন তবু মনে মনে দুঃখ পেলেও এদের কিছু বলে নি। আবার হবুর দেশে যখন মহামারী হল, আর একে একে লোকেরা মরতে শুরু করল, তখন শোনা যায় তবুই তো হবুকে এক বিশেষ নামতা শিখিয়েছিল লাশ গোনার জন্য – ‘রাম দুই তিন চার এটা-ধরতে-নেই পাঁচ ছয় সাত এটা-ধরতে-নেই আট নয়…’। ভাগ্যিস শিখিয়েছিল, সেই গোনার জোরে হবু ডাবুর থেকে অনেক টাকা পেয়েছিল। তার খানিক বখরা তবুকেও দিয়েছিল। সেই গর্বে তবু দুধসাদা ফিটনগাড়ি চড়ে সাদা পোষাক সাদা চটি পরে হাতে চক-ডাস্টার নিয়ে ঘুরে বেড়াতে শুরু করে আর মাঝে মাঝে গাড়ি থেকে নেমে প্রাইমারি দিদিমনির মত চক দিয়ে ‘গোল করিও’ শেখাতে শুরু করে। সেই ঘোরার সময় আর ‘গোল করিও’ শেখানোর সময় তার পথের দুদিক থেকে আওয়াজ উঠত ‘আমাদের গর্ব। দানী দানী’। তবুর সমস্ত যাত্রাপথ জুড়ে সেই আওয়াজ শেষ হত না। আবেশে চোখ বুজে তবু ভিক্টোরিয়ার মত চলত। লোকশ্রুতি আছে, একবার এক ছোট্ট পঙ্গু ছেলে ‘দানী’ বলতে গিয়ে মুখ ফসকে ‘ডাইনি ডাইনি’ বলে ফেলেছিল। শুনেই নাকি তবু ছুটন্ত ফিটনগাড়ি থেকে লাফ মেরে নেমে সেই বাচ্চাটার পেছনে ‘আয় বলছি হবুর চামচা, আয়, আমার সামনে আয়’ বলে এমন তেড়ে গেছিল যে বাচ্চাটা নাকি কয়েক সেকেন্ডে একপায়ে তালগাছে উঠে গেছিল। এমনকি একটা গরুও নাকি ভয়ে সেই বাচ্চাটার সঙ্গেই গাছে উঠে পড়েছিল। অসাধারন এইসব ঘটনা তবুর অনুপ্রেরণাতেই হত। তবুর রাজ্যে গাছগুলোয় এত সুন্দর সিঁড়ি কাটা থাকত যে যখন খুশি যে কেউ গাছে উঠে যেতে পারত। মরে যাওয়া মানুষগুলোও নাকি তবুর অনুপ্রেরণায় বেঁচে উঠে গাছে চড়ে ভোট দিয়ে আসত, সেখান থেকে সরকারি ত্রান নিয়ে আসত।

    তবুর ছত্রছায়ায় তবুর সান্নিধ্যে অনেক শিয়াল-পন্ডিত তৈরি হয়েছিল যারা এত সুন্দর একটা কুমিরছানাকে সাতবার দেখিয়ে হবুর দেওয়া সাতটা মোহর টাকরায় ঢুকিয়ে নিত যে তবু পর্যন্ত অবাক হয়ে যেত। এই কানামাছি ভোঁ ভোঁ খেলায় এমনকি টাকরার টক্‌ টক্‌ শব্দ পর্যন্ত হত না। সেই যেবার বন্যায় গ্রামের ঘরবাড়ি ডুবে গেল, তবুর-মোসাহেব তার-ছেলে ছেলের-শালা শালার-পিসতুতো-বোন বোনের-খুড়ো খুড়োর-তুতো-জামাই জামায়ের-ভায়রা-ভাই, যারাসব শহরে থাকে, নৌকো কেনার টাকা পেয়েছিল। পায়নি শুধু নদীর ধারের মুটে-মজুর-চাষী গুলো, কারন তাদের দরকার ছিল না। ওদের গ্রামে একটা ফুটো সরকারী নৌকো আগেই রাখা ছিল।

    তবুর ভ্যানিশ করে দেওয়া খেলা কালে কালে জনপ্রিয়তার শিখর ছুঁয়েছিল। এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে তার দলের সেনাপতি সান্ত্রী পেয়াদা কোটাল সবাই সেই খেলা শিখে বলে বলে ভ্যানিশ করে দিতে পারত। ছোট ছোট আধুলি কয়েন মোহর নোট থেকে শুরু করে ইঁট-কাঠ-সিমেন্ট চাল-ডাল-আটার বস্তা এমনকি মানুষও। জনশ্রুতি শোনা যায়, হুডিনি এসে নাকি রোজ তবুর পায়ের ধূলো নিয়ে ফল্গু নদীর তীরে ‘অথৈজলে বাক্স থেকে মানুষ ভ্যানিশ’ ম্যাজিক শিখে যেত। হুডিনির চামচারা শিখত তবুর পেয়াদা কোটালদের থেকে। একটা গোটা রাজ্যে এত জাদুকর আর কখনো দেখা যায় নি, তাই এই আশ্চর্য ঘটনায় গিনেস বুকে শিঙেরাজ্যের নাম উঠেছিল। কিন্তু তবুর দুর্ভাগ্য, অনেকেই থাকে যারা অন্যের ভালো সহ্য করতে পারে না। তাই কিছু গরিব-গুর্বো-শ্রমিক-ছোটলোকের দল তবুর স্বপ্নের প্রোজেক্ট ‘উঁকি বুঁকি রম্বা হো লেখো’-য় এই গর্বভরা ভ্যানিশ খেলাকে বঞ্চনা হিসেবে দেখিয়ে দিস্তে দিস্তে চিঠি লিখে হৈ চৈ শুরু করে। ভাগ্যিস তবু ঠিক সময়ে নিজগুণে এদের সবাইকে চিঠিসমেত ভ্যানিশ করে দেয়, নাহলে যে কি মুশকিল হত!

    তবুর ছেলের নামটি ভারি খাসা – ‘আল্লা মেহেরবান তো গাধা পেহেলবান’। যে রাতে তবুর ছেলে হয়, সে ছিল এক দুর্যোগের রাত। গোটা পৃথিবীতে সেদিন কেউ জেগে ছিল না, কেউ জানতেই পারেনি। শুধু এক পোষা গাধা রয়ে গেছিল। ছেলে হবার পর তার পিঠেই ছেলেকে নিয়ে তবু রাজপ্রাসাদে ফিরেছিল। সেরাতে আকাশবাণী হয়েছিল। কেউ বলেছিল, এই ছেলে বড় হয়ে গোটা রাজ্য আলোয় ভরিয়ে দেবে – একদম মেন্টোসের মত। তখন খুশি হয়ে তবু ছেলের ঐ নাম রাখে। একটু বড় হতেই ছেলেকে ‘সব পাড়ায় আছি পরিষদ’-এর মাথায় বসিয়ে দেয়। পাড়ায় পাড়ায় সেইসব পরিষদের সদস্য ছিল তবুর অগণিত ভক্তরা আর বকলমে সেই বিশ্বস্ত হাকিম। সঙ্গে ছিল ডিজনি কমিকের বালু। তাদের কাজ ছিল শরীরচর্চা, অস্ত্রচর্চা আর উন্নয়নের চাঁদা তোলা। এরা তবুর ছেলেকে মাথায় বসিয়ে রাখত। কিছুদিন পর তবু হিরের টুকরো ছেলেকে হীরক রাজার দেশে পাঠিয়ে দেয়। ছেলেটি চমৎকার। হীরক রাজার দেশ থেকে হীরের মত আলো এনে সত্যিই গোটা শিঙেরাজ্য তিনফলা আলোয় ভরিয়ে দিয়েছিল। পরিবর্তে নিজের জন্য রেখেছিল এক টুকরো গানের কলি – ‘আলো আমার আলো ওগো, আলোয় ভুবন ভরা’ আর ব্যাগভর্তি আলো। 

    শোনা যায় মহামারীর সময়ে নাকি তবু নিজের ছেলের আর প্রজাদের মন ভাল করার জন্য এক অদ্ভুত খেলা আবিষ্কার করেছিল যা আজ অব্ধি ইতিহাস-ভূগোল-বিজ্ঞানে কেউ করে দেখাতে পারে নি। সেই খেলার নাম ছিল ‘লক-ডাউনের তালা খোঁজা খেলা’। রাজ্যে লক-ডাউন চলাকালীন তবু অফিস-কাছারি, দোকানপাট, ব্যবসা-বানিজ্য, মন্দির-মসজিদ-গীর্জা, শুটিং-লুটিং-পরিষদ, চা-সিগারেট-গুটখা-মদের দোকান, ঘোরাফেরা, পাড়ার আড্ডা, সিনেমা, ঘুগনি-ফুচকা, গরুগাড়ি-ছাগলগাড়ি-মোষগাড়ি-ঘোড়াগাড়ি, ভীড়-ঠেলাঠেলি…সব খুলে দিয়েছিল। দিয়ে বলেছিল, হুঁ হুঁ বাবা, এখনো কিন্তু লক-ডাউন চলছে, এবার খুঁজে দেখাও তো দেখি লক-ডাউনের সেই তালাটা কোথায় রয়েছে! শোনা যায়, লক-ডাউনের সেই তালা আজো কেউ খুঁজে বের করতে পারে নি। মাথামোটা নির্বোধ প্রজাদের দল আসলে বুঝতেই পারেনি লক-ডাউনটা কোথায়, তাই তালাও খুঁজে পায় নি। এমনকি জন ন্যাশ আর অ্যালান টুরিং-ও এই খেলার উত্তর দিতে পারে নি।

    এই খেলা আবিষ্কারের জন্য রয়েল সুইডিশ একাডেমি নাকি তবুকে ‘লাইফটাইম নোবেল পুরস্কারের’ জন্য মনোনীত করে বলেছিল এরপর আগামি পঞ্চাশ বছর নোবেল দেওয়া বন্ধ থাকবে। এবার বুঝতে পারলেন, তবু কত মহান্‌! কিন্তু ঐ যে, আগেই বলেছিলাম, তবুর উন্নতিতে এত লোক তাকে হিংসে করত যে সেই পুরস্কারের জন্য তবুর নাম মনোনীত হতেই নাকি সেই পেল্লায় মেডেল নিজে থেকেই ভ্যানিশ হয়ে যায়। সে যাই হোক, আজও শিঙেরাজ্যের লোকেরা তবু-কে দেবী হিসেবেই পূজো করে, তবুর মাথার ঘিলু আর পায়ের চটি আজও মিউজিয়ামে রাখা আছে পৃথিবীর শেষতম আশ্চর্য হিসেবে।

    Published:

    Follow TIME8.IN on TWITTER, INSTAGRAM, FACEBOOK and on YOUTUBE to stay in the know with what’s happening in the world around you – in real time

    First published

    ট্ৰেণ্ডিং