21 C
Guwahati
Wednesday, November 24, 2021
More

    ছয় নং ধারা : প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে

    রাহুল রায়

    ‘ওরা আমাদের ভাষা ছিনিয়ে নিতে চাইছে’, ‘ওরা আমাদের রাজনৈতিক অধিকারে হাত দিতে চাইছে’, ‘এমনিতেই তো আমাদের ছেলেমেয়েদের চাকরি দেওয়া হয় না, এখন সেটা আইন করে একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হবে’, ‘আমাদের নিজেদের জমির অধিকার পর্যন্ত এরা ছিনিয়ে নিতে চাইছে’। আসাম চুক্তির ছয়-নং ধারা বাস্তবায়ন নিয়ে শর্মা কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে বরাক উপত্যকায় প্রায় সবকটি শিক্ষিত মানুষের কথা প্রসঙ্গেই এই চিন্তাগুলো আজকাল খুব সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। নিছক নির্ভেজাল আড্ডার মধ্যেও আগাম দিনগুলো নিয়ে এই উদ্রেক-ভীতি প্রকাশ পাচ্ছে। লক্ষণীয় ভাবে সেটা প্রকাশ পাচ্ছে সেই ‘আমরা-ওরা’ বিভাজন মন্ত্রে। ‘আমরা’ বলতে স্থানীয় বরাকবাসীরা বিশেষ করে বাঙ্গালীরা এবং ‘ওরা’ বলতে ব্রহ্মপূত্র উপত্যকার অসমীয়াভাষীরা। এবং স্বাভাবিক ভাবেই এই সমস্যার কারণ হিসাবে দেখানো হচ্ছে দ্বিতীয় পক্ষকেই। নিজেদের অজান্তেই মানুষ নিজেদের মননে একটি বিশেষ ভাষিকগোষ্ঠীর প্রতি অন্য ভাষিকগোষ্ঠীর লোক সন্দেহ, অবিশ্বাস, দ্বেষ পুষে তুলতে শুরু করেছে। নিজেদের সম্ভাব্য পরিণতির জন্য অভিযুক্ত করতে শুরু করেছে।

    কিন্তু বাস্তবটা কি তাই? ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার মানুষ মাত্রেই কি বাঙ্গালী বিদ্বেষী? সব দোষে কি তাঁদের অভিযুক্ত করাটাই যথাযথ? উত্তর আসবে অসমীয়াভাষীরাই তো আসাম চুক্তি অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। তাঁরা আন্দোলন করছেন বলেই চাপে পড়ে সরকার এই দিকে হাঁটছে, কমিটি গড়ে ‘সাম্যবাদী সরকার’ সংখ্যাগরিষ্ঠদের পক্ষে আইন প্রণয়ণ করতে ‘বাধ্য’ হয়েছে। শুরু করা যাক অসমীয়াভাষীদের আন্দোলন নিয়েই।এই আন্দোলন শুরু হয়েছে ৭০ এর দশকের গোড়ায়, আসাম চুক্তি সম্পাদন হয় ১৯৮৬ সনে, কিন্তু ৯০ এর দশকের শেষ দিক থেকে সেই আন্দোলন স্তিমিত হতে শুরু করে। তারপর থেকে প্রায় দেড় দশ্কে সেই আন্দোলন ঝিমিয়ে ঝিমিছে প্রায় নিঃস্ব হতে বসেছিল। ২০১৫ এর পর থেকে সেই আন্দোলন আবার ধীরে ধীরে নিজের পায়ের নীচের জমি শক্ত করতে শুরু করে। ২০১৪ সনে কেন্দ্রে সরকার বদল হয়, ২০১৫ সনে দীর্ঘদিন থেকে আটকে থাকা নাগা চুক্তি স্বাক্ষর হয় এবং ২০১৬ সনে এই রাজ্যে সরকার বদল হয়। এই সময়েই হঠাৎ করেই মেঘালয়, মণিপুরে ইনার লাইন পারমিটের দাবী উঠতে শুরু করেছে, মিজোরামে এমনকি ত্রিপুরাতে পর্যন্ত বহিরাগত বিশেষ করে বাঙ্গালী বিদ্বেষ বাড়তে শুরু করে। মেঘালয়ে অবস্থা এতই খারাপ ছিল যে রাজ্যপালকে পর্যন্ত মন্তব্য করতে হয়েছে। উল্লেখযোগ্য যে সবগুলো রাজ্যতেই এই সময়ে সরকার বদল হয়েছে। ঘটনাগুলোকে কি এক সুত্রে আনাটা খুব একটা কষ্টকল্পনা? লক্ষণীয় যে উত্তর-পূর্ব ভারতে ভাষিক জাতীয়তাবাদ ও একটি জাতীয়তাবাদী দলের প্রবল উত্থান একই সঙ্গে কিন্তু হচ্ছে।

       বাস্তবে ঘৃণার পরিবেশে কেউই থাকতে চায় না। মানুষ সামাজিক জীব, মিলে মিশে থাকতেই সে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাঁকে সেই স্বাচ্ছন্দ-চক্রের বাইরে প্রয়োজন পারিপ্বার্শিক অবস্থার অস্বাভাবিক পরিবর্তন। এখন প্রশ্ন দাঁড়ায় উত্তর-পূর্ব ভারতে বিশেষ করে অসমে এমন কি হল যে সংখ্যাগুরু অসমীয়াভাষীদের একটি বড় অংশকে সংকীর্ণ, আত্মকেন্দ্রিক এবং আগ্রাসী করে তুললো। উত্তরটার কারণ পেতে হলে একটু পিছিয়ে যেতে হবে, ভারতবর্ষের অন্যান্য জায়গার তুলনায় উত্তর-পূর্ব ভারত সবসময়ই কিছুটা পিছিয়ে ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পার্থক্য কমানোর পরিবর্তে কিন্তু বেড়ে গেছে। বেকারত্ব, দারিদ্র, অশিক্ষা, শিল্পোদ্যোগের অভাব, নিয়মিত বন্যার প্রকোপ, পরিকাঠামোগত দুর্বলতা প্রতিটি বিষয়েই এই অঞ্চলের মানুষকে দীর্ঘদিন থেকে দগ্ধ হতে হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই এই অবস্থা পরিণতে জনমানসে দাবি উঠতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দাবি এত মারাত্মক হয়ে ওঠে যে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকারকেই পাল্টে দেওয়ার অবস্থায় পৌঁছে যায়। সূযোগটা নেয় একদল স্বার্থান্বেষী জাতীয়তাবাদীরা। বিদ্বেষের বীজ বোপন শুরু হয়ে যায়। ক্ষমতায় আসলে ‘বহিরাগতদের’ তাড়িয়ে, সবরকম অধিকার খর্ব করে ভূমিপুত্র বা ‘খিলঞ্জীয়াদের’ অধিকার সুরক্ষিত করার প্রচার শুরু হয়ে যায়।

    ২০১৯ সনে প্রণিত সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে ভারতবর্ষের বাইরে থেকে আগত অমুসলমানদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করার পর অসমে এই আইনের মারাত্মক বিরোধীতা শুরু হয়। কারণ এতে তাঁদের শত্রু হিসাবে দেখানো ‘বহিরাগতদের’ একটি বড় অংশকে নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা আছে। এখানে মনে রাখতে হবে যে বর্তমানে ভারত ও অআসামে একই রাজনৈতিক দলের শাসন চলছে। স্বাভাবিক ভাবেই সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে দেশজুড়ে মানুষের বিশাল সমর্থন পেলেও অসমে সরকারকে বিপাকে পড়তে হয়। অবস্থা সামলাতে এবার আসাম চুক্তির ছয়-নং ধারার পালে হাওয়া দেওয়া শুরু হয়। প্রচার করা হয় সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই, ছয়-নং ধারা প্রণয়ণ করে বরং খিলঞ্জীয়াদের অধিকার আরো বেশি করে সুরক্ষা করা যাবে। ভিত্তিবর্ষ ১৯৭১ এর বদলে ১৯৫১ করা হবে এবং তাই হল বাস্তবে, রাজ্য সরকারের তৈরি শর্মা কমিটির আসাম চুক্তির ছয়-নং ধারা নিয়ে ফাঁস হওয়া প্রতিবেদন যার জ্বলন্ত প্রমাণ। আগামী দিনগুলোতে কি হবে সেটা আজ বলা দুষ্কর । পৃথক বরাক থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় শাসিত অঞ্চলে পরিণত করার কথা উঠছে, ছয় নং ধারা থেকে বরাক উপত্যকাকে বাইরে রাখার কথাও হচ্ছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ তার ঝুলিতে এই রাজ্য তথা রাজ্যবাসীর জন্য যাই সযত্নে সঞ্চয় করে রাখুক, আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমাদের পক্ষে নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ‘আমরা-ওরা’ নামক অদৃশ্য প্রাচীর তুলে নিজেদের মধ্যে ভিন্নতার পরিবেশ তৈরি করে আর যাই হোক ইতিবাচক কিছুই হবে না। আগামীতে বরাক বর্তমান অবস্থাতেই থাক বা পৃথক রাজ্য হোক বাকেন্দ্রীয় শাসিত হোক বা যাই হোক, এই নীচ স্বার্থের লোকগুলো কিন্তু তখনও  থাকবে এবং বলা বাহুল্য নিজেদের ঘৃণ্য খেলা এরা চালিয়ে যাবেন। এদের রুখতে এদের পরিচয়,  এদের নীতি, উদ্দেশ্যটা সর্বাগ্রে বুঝতে হবে।  বর্তমানে ছয় নং ধারা নিয়ে সৃষ্ট এই পরিস্থিতি সম্পর্কে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে আগে পর্দার পেছনের এই কারিগরদের জানতে হবে, তাঁদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বুঝতে হবে অন্যথায় হাত কিন্তু রিক্তই থাকবে, সামাজিক জীবনে শুধু ‘আমরা-ওরা’ নামক প্রাচীরের সংখ্যাই বাড়বে।  

    Published:

    Follow TIME8.IN on TWITTER, INSTAGRAM, FACEBOOK and on YOUTUBE to stay in the know with what’s happening in the world around you – in real time

    First published

    ট্ৰেণ্ডিং