19 C
Guwahati
Sunday, November 27, 2022
More

    করিমগঞ্জ সীমান্তে মিজো আগ্রাসন, অসমের উচ্ছেদ করা জমিতে সশস্ত্র বাহিনীর ক্যাম্প

    মনোজ মোহান্তি, নিভিয়া

    করিমগঞ্জ জেলা প্রশাসন গত শুক্রবার অসম-মিজোরাম সীমান্তে মিজোদের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করার দু-দিনের মধ্যেই মিজোরাম সরকারের মদতে পুনরায় আগ্রাসন শুরু হয়েছে। রাতাবাড়ি কেন্দ্রের চেরাগি ফরেস্ট রেঞ্জের সিংলা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বহু জমি পার্শ্ববর্তী মিজোরামের মামিত জেলার মিজো গ্রামবাসীরা জবরদখল করে রেখেছিল। বনবিভাগের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে করিমগঞ্জের জেলাশাসক এমপি অম্বামুদন ও পুলিশ সুপার কুমার সঞ্জিত কৃষ্ণা বিশাল পুলিশ ও ফরেস্ট বাহিনী নিয়ে রংপুরের লাগোয়া ছোটভুবিরবন্দ সংলগ্ন সিংলা রিজার্ভ ফরেস্টে উচ্ছেদ অভিযান চালান। এতে মিজোদের তৈরি করা একটি ঘর গুড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি কেটে ফেলা হয় জুম খেত। উপড়ে ফেলা হয় মিজোরামের দ্বারা স্থাপন করা মনরেগা প্রকল্পের তথ্য ফলক। এতে মিজোরাম সীমান্তবর্তী অসমের উপজাতি গ্রামের মানুষ সন্তোষ প্রকাশ করলেও মাত্র দু-দিনের মধ্যেই তাদের রাতের ঘুম উবে গেছে। কেননা পাল্টা জবাবে মিজোরাম সরকার ওই স্থানেই আই আর ব্যাটেলিয়নের ক্যাম্প তৈরি করে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, মিজো ছাত্র সংগঠন এমজেডপি, ইয়ং মিজো অ্যাসোসিয়েশন ও মিজো ন্যাশনাল ইয়ুথ ফ্রন্ট উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষেপে গিয়ে  আরও তীব্র আগ্রাসন শুরু করেছে। তাদের মদতে ও মিজোরাম সরকারের ছত্রছায়ায় সশস্ত্র বাহিনীর সুরক্ষা বেষ্টনীতে মামিত জেলার বাসিন্দারা অসমের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে যুদ্ধস্তরীয় তৎপরতায় ঘরবাড়ি তৈরি করে জবরদখল করার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। এতে আগের চেয়েও বেশি জমি মিজোরামের কব্জায় চলে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এমনকি ভুবিরবন্দ গ্রামকেও তারা দখল করে নেওয়ার পরিকল্পনা তৈরি করে নিয়েছে বলে এক সূত্রে জানা গেছে।

    উচ্ছেদ হওয়া এলাকায় মিজোরামের আই আর ব্যাটেলিয়নের স্থায়ী অবস্থান ।

    করিমগঞ্জ জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযানের পরদিন মিজোরামের মামিত জেলার জেলাশাসক ডঃ লালরোজামা, এস পি শশাঙ্ক জয়সওয়াল সহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিক মিজো পুলিশ ও আই আর ব্যাটালিয়নের বিশাল সশস্ত্র বাহিনী তথা মিজোরামের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্বে প্রায় একহাজার মিজো নাগরিক স্থানটি পরিদর্শন করেন। তারা উচ্ছেদকৃত জমি মিজোরামের বলে দাবি করে করিমগঞ্জ জেলা প্রশাসনকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সেদিন থেকেই জমিতে সশস্ত্র বাহিনীর  অস্থায়ী শিবির পেতে রাখে। শুধু তাই নয়, করিমগঞ্জের বনবিভাগ তাদের থিঙলুঙ্গ গ্রামের কৃষক জন জোলাওমা ও বেন ডেভিডার ফার্ম হাউস জ্বালিয়ে এক হাজার সুপারী গাছ সহ শাক সব্জির জুম কেটে ফেলার অভিযোগ তুলে মিজোরামের  কানমুন থানায় করিমগঞ্জের বনবিভাগের বিরুদ্ধে একটি মামলাও রুজু করেছে। সোমবার মিজোরামের ডিজিপি, বিধানসভার অধ্যক্ষ ও তিন বিধায়কের উপস্থিতিতে ওই স্থানে আইআর ব্যাটেলিয়নের জন্য স্থায়ী শিবির গড়ে তোলা হয়েছে বলে স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে। মিজোরামের  আইআর ব্যাটেলিয়ন অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে গোটা অঞ্চলে নজরদারি করছে। এতে অসমের ভুবিরবন্দ এলাকার বাসিন্দারাও ওই এলাকায় যেতে পারছেন না। এমনকি চেরাগি ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার যতীন্দ্রমোহন দাস চেষ্টা করেও সুরক্ষাহীনতার কারণে সেদিনের উচ্ছেদ করা এলাকায় যেতে পারেননি। বর্তমানে রাতাবাড়ির মিজোরাম সীমান্তবর্তী এলাকায় পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। যে কোনও সময়ে পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ ধারণ করার সন্দেহে চরম সুরক্ষাহীনতায় ভুগছেন এলাকার মানুষ। তবে মিজোরাম সরকার ও সেখানকার বিভিন্ন সংগঠন বিষয়টি নিয়ে যত তৎপর তার সিকিভাগও পরিলক্ষিত হচ্ছে না অসম সরকারের পক্ষে। উচ্ছেদ অভিযানের পর করিমগঞ্জ জেলা প্রশাসন ওই এলাকায় সুরক্ষা বাহিনী মোতায়েন না করার সুযোগে মিজোরামের তরফে পুনরায় ওই সব এলাকা জবরদখল করে তীব্র আগ্রাসন শুরু হয়েছে।তবু ভাতঘুমে রয়েছে অসম সরকার।

    সরকারি উদাসীনতার দরুণ করিমগঞ্জের সীমান্তবর্তী ওই সব এলাকায় উন্নয়নের ছোয়া পর্যন্ত লাগেনি। স্বাধীনতার সত্তর বছর পরও অসমের উপজাতি গ্রামের মানুষ আদিম যুগের ন্যায় বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারি উপেক্ষায় তৈরি হয়নি পাকা সড়ক, নেই স্কুল, হাসপাতাল ও বিশুদ্ধ পানীয়জলের ব্যবস্থা।  পক্ষান্তরে মিজোরামের অংশের গ্রামগুলিতে পাকা সড়কে যানবাহন চলাচল করছে, গড়ে উঠেছে অত্যাধুনিক পরিকাঠামো । ফলে অসমের অংশের ছোট ভুবিরবন্দ, বড় ভুবিরবন্দ ইত্যাদি  গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দারা মিজোরামের উপর অনেকটা নির্ভরশীল হতে বাধ্য। অসমের ভোটার তালিকায় নাম থাকলেও তারা মিজোরাম সরকারের সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করতে বাধ্য। মিজোরাম সরকার তাদের গ্রামে মিশনারী স্কুল চালাচ্ছে। রোগব্যাধিতে মিজোরামের হাসপাতালে চিকিৎসা পাচ্ছেন তারা। কর্মসংস্থানের জন্যও অনেকেই মিজোরামের উপর নির্ভর। জানা গেছে, এক সময়ে ওই সব গ্রামের উপজাতিরা হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে তাদের অনেকাংশই খ্রিষ্ট ধর্ম অবলম্বন করে নিয়েছেন এবং মিজোরামে শামিল হয়ে যেতে আগ্রহী। তবে যারা এখনও ধর্ম পরিবর্তন করেননি বা অসমের প্রতি এখনও আস্থাবান, বর্তমান পরিস্থিতিতে তারাই চরম সুরক্ষাহীনতায় ভুগছেন। ফলে শীঘ্রই অসম সরকারকে মিজোরামের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের আর্জি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় রাতাবাড়ির বহু উপজাতি গ্রাম সহ সংরক্ষিত বনাঞ্চল মিজোরামের দখলে যাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা।

    Published:

    Follow TIME8.IN on TWITTER, INSTAGRAM, FACEBOOK and on YOUTUBE to stay in the know with what’s happening in the world around you – in real time

    First published

    ট্ৰেণ্ডিং